Wednesday, December 31, 2008

ভুলি নাই তাহারে ...



পিতার সরকারী চাকুরির কল্যাণে আমাকে জীবনে বহু জায়গায় থাকিতে হইয়াছে। তাহার পোস্টিং যখন চিটাগং-এ ছিল তখন আমরা চিটাগং শহরের সি.ডি.এ. তে এক বাসার নিচ তলায় থাকিতাম। সেইখানেই তাহার সহিত আমার পরিচয়। আমাদের পাশের বাসায় তাহারা থাকিত। আমি তখন অনেক ছোট। মাত্র ক্লাস ১-২ তে পড়ি। ভালবাসা অনুভব করিবার মতন মানসিক বিশালতা তখনও বোধ করি আমার হয় নাই। সুতরাং তাহার প্রতি আমার যে অনুভূতি ইহাই যে ভালবাসা, ইহার জন্যই যে বালক-বালিকারা তাহাদের সর্বস্ব উজাড় করিয়া দিতে এতটুকু দ্বিধা করে না তাহা বুঝিতে আমার অনেক দেরী হইয়া গিয়াছিল। ততদিনে পাশে তাকাইয়া আর তাহারে পাই নাই।

ছোট ছোট মানুষের, ছোট ছোট অভিমান কিন্তু বিশাল তাহার গভীরতা। মা যখন বলিত, ' আর খেলিতে হইবে না ' বা ' পড়িতে বস ', ' আজ টিভি দেখিয়া কাজ নাই ' তখন তা আমার ছোট অনুভূতিতে বড় দাগ কাটিত। আমি তখন মুখখানা বাংলা ৫ এর ন্যায় করিয়া বাসার সামনের সিড়িতে বসিয়া নিঃশব্দে বড় মানুষদের প্রতি আমার বিস্বাদ প্রকাশ করিতাম। তখন-ই হঠাৎ  মরুর বুকে ঝর্ণাধারার মতন তাহার আবির্ভাব ঘটিত। বলাবাহুল্য যে আমার অগ্নিসম অভিমান নির্বাপনে সেই ঝর্ণাধারার এক ফোটা পানিই যথেষ্ট ছিল।

গল্পের নারীকুলের হাসি হইতে যদি মুক্তা ঝরিয়া থাকে তবে তাহার হাসিতে হীরক ঝরিত যাহা আমার কাচের ন্যায় হৃদয় কে টুকরা টুকরা করিত প্রতি মুহূর্তে। তাহার অধর চুইয়া যে হাসি পড়িত, পিপাসার্ত আমি তাহার এক বিন্দুও অপচয় করিতাম না। তাহার কপোলের চুল সরাইবার মাঝে যে অনুপম স্বকীয়তা আছে তাহা আমি আর কাহারও মাঝে দেখি নাই। বহুজনের মাঝে বহুজনরে খুজিয়া পাই কিন্তু কাহারো মাঝে তাহারে খুজিয়া পাই নাই।

একদিন বৈকালে আমাদের বাড়িওয়ালার পুত্রের সহিত তাহার দ্বিচক্রযান ভ্রমণের কথা আমি আজও ভুলি নাই। হঠাৎ করিয়া বাড়িওয়ালা পুত্রের অসাবধানতাবশত সে ভূপাতিত হইল। এই দৃশ্য দেখিয়া আমার অন্তরে সুখ বাদ্য বাজিয়া উঠিল। আমি এতখানি খুশী হইয়াছিলাম যে একখানা আনন্দসূচক শব্দ করিয়া ছিলাম। অনেকে হয়ত ইহাকে তাহার পতন দৃশ্য দেখিয়া আমার আনন্দের বহিঃপ্রকাশ বলিয়া ভাবিতে পারেন কিন্তু বাস্তবে তাহা ভুল। তাহার প্রতি বাড়িওয়ালা পুত্রের এরূপ উদাসীনতাই আমার আনন্দের কারণ ছিল। আর কোনোদিন সে বাড়িওয়ালার পুত্রের সহিত দ্বিচক্রযানে ভ্রমণ করিবে না- এ কথা ভাবিয়া এতখানিই খুশী হইয়াছিলাম যে পতনোক্ত তাহার যে ব্যাথা অনুভূত হইতে পারে তাহা আর আমার মাথায় আসে নাই। ক্ষমা করিবেন পাঠকবৃন্দ, আমি তখন অনেক ছোট ছিলাম।

এই ঘটনার পর আমি আমার পিতার নিকট একখানা দ্বিচক্রযানের জন্য বায়না পেশ করিলাম। আমার অনেক সাধ ছিল তাহার সহিত দ্বিচক্রযানে ভ্রমণ করিব। অবশেষে আমার পিতা আমাকে একখানা দ্বিচক্রযান কিনিয়া দিয়াছিলেন বটে কিন্তু আমার সাধ আর পূরণ হয় নাই। কারণ দ্বিচক্রযান চালানো শিখা সহজ ছিল না। যতদিনে আমি দ্বিচক্রযান চালানো শিখিয়াছিলাম ততদিনে আমাদের পরিবার ওই বাসা ত্যাগ করিয়াছিল।

ওই বাসা ত্যাগের পর দীর্ঘদিন তাহার সহিত আমার দেখা হয় নাই। অনেক দিন কাটিয়া গেলো। শৈশব-কৈশোরও আমার পাশ কাটাইয়া গিয়াছে অনেক দিন হইল। এখন আমি বড় হইয়াছি। পিতা মাতা সহ ঢাকায় বসবাস করিতেছি। কিন্তু তাহাকে ভুলি নাই এতটুকুও। আজো সে আছে আমার মনের মাঝে যেইভাবে তখন ছিল। আজও চিটাগং যাইলে সেই বাসায় একবার ঘুরিয়া আসিতে আমার ভুল হয় না। জানিনা আর কোনোদিন তাহার দেখা পাইব কিনা তবুও শূন্য দৃষ্টি তাহারে খুজিয়া ফেরে শত মানুষের ভীড়ে।

আজও ভুলি নাই তাহারে, জানি ভুলিব না। আজও মমতাময়ী সে আমার কাছে স্বকীয় এক মানবী।

No comments:

Post a Comment