Sunday, August 10, 2008

বাংলা মুভি রিভিউ : রিকশাওয়ালার প্রেম



বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্রাক ব্যবসায়ী সফদর আলী তরফদারের একমাত্র আদরের কন্যা কেটি। মা মরা এই মেয়েটাকে সফদর সাহেব অনেক স্নেহ করেন। মেয়ের কোন ইচ্ছাই তিনি অপূর্ণ রাখেন নাই। অনেক শখ করে মেয়ের নাম রেখেছিলেন কইতরী। কিন্তু বড়লোকের মেয়ের status-এর সাথে এই নাম যায় না তাই কইতরী তার নাম পালটে করে দিল কেটি। সফদর সাহেবের নামটা মোটেও পছন্দ হয় নাই কিন্তু একমাত্র মেয়ে বলে মেনে নিলেন।

কেটি গুলশানে তার আলীশান বাড়ির দোতালার বারান্দায় বসে রোদে চুল শুকাচ্ছিল। বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে এলাকার রিকশাচালক সমিতির উঠতি নেতা কেরামত তার রিক্সা চালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তা দিয়ে গার্মেন্টসকর্মী সখিনাকে হেটে যেতে দেখে কেরামত শিষ দিল। ভুল বুঝাবুঝির কারণেই হোক অথবা বাংলা সিনেমা বলেই হোক সেই শিষের শব্দ কেটি সাহেবার কানে গেল। কেটি সাহেবার শিশু মন ধনী-গরীব বুঝে না। তাই কেরামতের সুরেলা শিষে “খাইরুন গো”-র টিউন শুনে কেটি তার প্রেমে পড়ে গেল। সেলুকাস, কি বিচিত্র এই বাংলা সিনেমা।

সেদিনই বারান্দা দিয়ে কেটি আর কেরামতের প্রথম পরিচয়। কেরামতেরও কেটিকে প্রথম দেখায় ভাল লেগে গেল। সিনেমার এই পর্যায়ে একটি প্রেমের গান(১)। কিছুদিন পর তাদের মধ্যে চিঠির সাহায্যে ভাবের আদান প্রদান হতে লাগল। মোবাইলের যুগেও তাদের মধ্যে চিঠি আদান প্রদান হচ্ছিল কারন কেরামতের কাছে মোবাইল ছিল না। কেটি কেরামতকে মোবাইল কেনার জন্য টাকা সাধলেও কেরামত তা নিতে রাজি হল না। কারন কেরামত আগেই পণ করেছিল যেদিন সে নিজের টাকায় একটা রিক্সার ওয়ার্কশপ খুলতে পারবে সেদিন সে মোবাইল কিনবে। ধীরে ধীরে কেটি কেরামত সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারল। জানতে পারল, পিতৃহীন কেরামত শুধু শিক্ষিতই না বরং উচ্চ শিক্ষিত। ঢাকা শহরে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা কোন এক ইউনিভার্সিটি থেকে সে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে। কিন্তু পাশ করার পর কোন চাকরি না পেয়ে আজ সে রিক্সার ইঞ্জিনিয়ার(মিস্ত্রি) ও পার্ট-টাইম রিক্সাচালক। ছাত্র অবস্থায় যে ছেলে গাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখত সেই কেরামত আজ রহিম মিয়ার ওয়ার্কশপে রিক্সা মেরামত করে। বিধির কি নিঠুর খেলা। সিনেমার এই পর্যায়ে একটি দুঃখের গান(২)।

কেটি আর কেরামতের সে প্রেম প্রেম খেলা যখন ধীরে ধীরে সেমিফাইনালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তখনই হঠাৎ সফদর সাহেব ব্যাপারটা ধরে ফেললেন। তিনিও তথা কথিত বাংলা সিনেমার ব্যতিক্রম না করে স্বীয় আদরের কন্যাকে একঘরে করে রাখলেন। সেইসাথে নিজের জিগরি দোস্ত কাদের মোল্লার একমাত্র লাফাঙ্গা ছেলে দাউদ ওরফে ড্যানি-র সাথে কেটির বিয়ে ঠিক করে ফেললেন।

ঘটনাক্রমে কেটির বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা কেরামত জেনে গেলো। সে তার বন্ধুদের পরামর্শে সফদর সাহেবের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেল। কিন্তু সফদর সাহেব কেরামতকে দেখেই ক্ষেপে গেলেন এবং বললেন কেটিকে বিয়ে করার কোন যোগ্যতাই তার নেই। সফদর সাহেব কেরামত কে বললেন তারা ধনী আর কেরামত গরীব। ধনী-গরীবের মধ্যে এইরকম সম্পর্ক অসম্ভব। কিন্তু কেরামত, সফদর সাহেবকে বিভিন্ন বাংলা সিনেমার রেফারেন্স দিয়ে বলল, “পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই”। অতপর সফদর সাহেব তাদের গ্যারেজ ভরা গাড়ির কথা বললে কেরামতও তার রিক্সার গ্যারেজের কথা বলে ও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে রিক্সার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে। এরপর সফদর সাহেব কেরামতকে তাদের বিশাল সম্পত্তি ও জমি-জমার হিসাব শুনালে কেরামতও জানিয়ে দেয় মিরপুরে তাদের ২ বিঘা জমির কথা। কেরামত ওই জমিতে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি করার যে স্বপ্ন দেখে তাও সে কেটির বাবাকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয় না। কেটির বাবা কোন মতেই কেরামত কে মেয়ের জামাই হিসেবে পছন্দ করতে পারে না। শেষে সফদর সাহেব কেরামতকে visionless ছেলে বললে কেরামত এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। নিজের একটা ওয়ার্কশপের যে স্বপ্ন সে বুকে ধারণ করে আছে তা সে সফদর সাহেবকে জানায়। ঢাকা শহরে নিজের একটা রিক্সার ওয়ার্কশপ থাকা যে কতটা সম্মানের এবং রিক্সার পিছনে ‘কেরামত মিস্ত্রি’ লেখা থাকা যে কি দারুন একটা ব্যাপার তা সে কেটির বাবাকে বুঝানোর সাধ্যমত চেস্টা করে। অবশেষে যুক্তি দিয়ে কেরামতকে পরাস্ত করতে না পেরে সফদর সাহেব তার দারোয়ান দিয়ে কেরামতকে বাড়ি থেকে অপমান করে বের করে দিলেন। সিনেমার এই পর্যায়ে আরো একটি দুঃখের গান(৩)।

এদিকে ওইদিনই ড্যানির মেয়ে দেখতে কেটিদের বাসায় যাওয়ার কথা। কিন্তু পথিমধ্যে কোন এক অজানা কারনে ড্যানির গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল। বেচারা ড্যানির গাড়িহারা হওয়ায় রিক্সা ছাড়া কোন গতি রইল না। আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক ওই সময় অপমানিত কেরামত মনের দুঃখে ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’ গাইতে গাইতে রিক্সা নিয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় এত রিক্সা থাকতে ড্যানিও কেরামতের রিক্সায়ই উঠে বসল। 

যাত্রাপথে আরেক কাহিনী। রাস্তা দিয়ে গার্মেন্টসকর্মী সখিনাকে হেটে যেতে দেখে আবারো শিষ দিল। কিন্তু এইবার শিষটা কেরামত দিল না, দিল লুইচ্চা ড্যানি। সখিনাকে কেরামত কেটির ব্যাকআপ হিসেবে দেখত। তাই সখিনার সাথে এরূপ ফাইজলামির সে প্রতিবাদ জানায়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ড্যানি কেরামতের গায়ে হাত তোলে। কেরামত এতে চরম ক্ষেপে গিয়ে ড্যানিকে পিটিয়ে তুলোধুনো করে ও অবশেষে নায়কসুলভ সহানুভূতি দেখিয়ে তাকে হাসপাতালে পৌছে দেয়। বেচারা ড্যানির আর সেদিন মেয়ে দেখতে যাওয়া হল না।
দুইদিন পর ড্যানি সুস্থ হয়ে কেটির বাসায় গেল। সেদিন আবার কেটি কেরামতের সাথে পালানোর প্ল্যান করেছিল। প্ল্যান মোতাবেক কেটি তার পেন্সিল হিল স্যান্ডেল দিয়ে জানালার কাচ ভেঙ্গে বিছানার চাদর দিয়ে তৈরী দড়ি বেয়ে নিচে অপেক্ষমান কেরামতের কাছে আসল। এদিকে কেটির রূমে এসে কেটিকে না পেয়ে তার বাবা ড্যানিকে জানাল। ড্যানি কেটিকে খুজতে বাইরে এসে দেখল কেটি কেরামতের সাথে রিক্সা নিয়ে পালাচ্ছে। কেরামতকে চিনতে পেরে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে ড্যানি তার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ওদের তাড়া করে। কেরামত পালানোর অনেক চেষ্টা করলেও ফার্মগেটের জ্যামে পড়ে ধরা খেয়ে যায়। ড্যানির বেদম প্রহারে কেরামত জ্ঞান হারায় আর কেটিতে ড্যানি তার গোপন আস্তানায় নিয়ে যায়।

জ্ঞান ফেরার পর কেরামত নিজেকে রক্তাক্ত অবস্থায় অসংখ্য ভাংতি টাকা আর পয়সার মঝে আবিস্কার করে। সে বুঝতে পারে লোকজন তাকে ফকির ভেবে এই টাকা দান করেছে। যাই হোক, কেরামত গুনে দেখে সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার টাকা(!!!) আছে। সে তাড়াতাড়ি পাশের এক দোকান থেকে তার বন্ধু আক্কাসকে ফোন করে বলে দেয় ১২ হাজার টাকা দিয়ে সে যেন রহিম মিয়ার ওয়ার্কশপ কিনে নেয়। ১ দিনের মধ্যেই কেরামত রহিম মিয়াকে টাকা শোধ করে দিবে। অতঃপর সে আক্কাসকে বলে ৫০ জনের একটা লাঠিয়াল রিক্সাবাহিনীকে ফার্মগেট পাঠিয়ে দিতে। পণ অনুযায়ী ওয়ার্কশপ কিনার পরই কেরামত ৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি Maximus-এর China মোবাইল সেট ও একটি ডিজুস সিম কিনল। অবশিষ্ট টাকা সে আসন্ন বিয়ের খরচ হিসেবে তার ব্র্যাক ব্যাংকের একাউন্টে জমা রাখল। ইতোমধ্যে তার লাঠিয়াল রিক্সাবাহিনী ফার্মগেট এসে পৌছল। সিনেমার এই পর্যায়ে একটি রক্ত গরম করা গান(৪)। কেরামত তার নয়া মোবাইলে GPS tracker দিয়ে কেটির মোবাইল track করে কেটির অবস্থান বের করল এবং তাকে উদ্ধারের জন্য রওনা হল। এভাবেই কেটি আর কেরামতের সে প্রেম প্রেম খেলা ফাইনালে উপনীত হল।

কেটিকে নিয়ে ড্যানি তার গাজীপুরের আস্তানায় আসল। অনেক চেষ্টা করেও ড্যানি কেটিকে বিয়েতে রাজি করাতে পারল না। কোন উপায় না দেখে ড্যানি কেটির বাবাকে ধরে আনতে লোক পাঠালো। এর মাঝে ড্যানি আর কেটির মধ্যে হালকা হাতাহাতি(!!!) হল। সিনেমার এই পর্যায়ে কেটি ‘তুই আমার দেহ পাবি কিন্তু মন পাবি না’ টাইপের একটা গান(৫) গেয়ে ফেলল। গান শেষ হতেই কেটির বাবাকে হাজির করা হল। ড্যানি সফদর আলীর মাথায় বন্দুক(খেলনার) ধরে কেটিকে বিয়েতে বাধ্য করতে চাইল। 

ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে কেরামত হাজির হয়ে গেল। কেরামতকে দেখে ড্যানি কথায় কথায় প্রচন্ড ভাব নিয়ে মুখের সিগারেটটা ছুড়ে ফেলল। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, সেই জ্বলন্ত সিগারেট গিয়ে পড়ল পেছনে রাখা তেলের ড্রামের উপড়। অমনি বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। হলিউডের কোন সিনেমা হলে এই বিস্ফোরণের আগুন আর ধোয়া প্রায় আকাশ ছুয়ে যেত। কিন্তু বাজেট স্বল্পতার কারনে এই সিনেমায় চুলার আগুন দেখিয়ে সেই বিশাল বিস্ফোরণের হালকা আমেজ দর্শকদের দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

যাই হোক, বিস্ফোরণ শেষে দেখা গেল কেরামত, তার রিক্সাবাহিনী, কেটি আর কেটির বাবা ছাড়া ঘটিনাস্থলে আর সবাই মারা গেছে। যথারীতি সবকিছু শেষ হওয়ার পর পুলিশ উপস্থিত হল এবং গ্রেফতার করার মত কাউকে না পেয়ে খালি হাতেই চলে গেল। 

এভাবেই কেরামত বিনাযুদ্ধে যুদ্ধজয় করল। কেরামতের এহেন বীরত্ব দেখে কেটির বাবা তার মেয়েকে কেরামতের হাতে তুলে দিতে রাজি হলেন। কেটি আর কেরামতের সে প্রেম প্রেম খেলার ফাইনাল এখানেই সমাপ্ত হল। সিনেমার এই পর্যায়ে আরো একটি প্রেমের গান(৬)।

সমাপ্ত